ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কাঙ্খিত মান

প্রত্যেক আদর্শিক আন্দোলনের কর্মীদের সুনির্দিষ্ট মিশন ও ভিশন থাকে। আন্দোলনের মিশন ও ভিশনই তাদের জীবনের মিশন-ভিশন। অব্যাহত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কেবল সে লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব। যারা জগতের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে বদ্ধপরিকর। যারা সাগরের উত্তাল তরঙ্গমালার বিপরীতে সামনে এগিয়ে চলে, প্রচন্ড ঝড়োহাওয়াকে পরোয়া করে না, যারা পাহাড়ের পাদদেশে লুকিয়ে থাকা ভয়ঙ্কর শত্রুর ব্যূহ ভেদ করে বিজয় ছিনিয়ে আনে, তারাই আদর্শিক কর্মী। তাদের হাতেই পৃথিবী পরাস্ত হয়। বিজয় ধরা দেয় হাতের মুঠোয়। এককথায় বলতে গেলে আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে যারা প্রস্তুত থাকে তারাই আদর্শবাদী কর্মী।
পক্ষান্তরে আদর্শবাদী আন্দোলনের দাবিদারদের মিশন-ভিশন যতই সুন্দর, যুগোপযোগী বা বাস্তবধর্মী হোক না কেন সে আদর্শে কর্মীরা যদি দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ী কঠিন পরিশ্রমপ্রিয় ও আদর্শের জন্য যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে প্রস্তুত না থাকে তাহলে সেই মিশন ও ভিশন দিয়ে পৃথিবী, দেশ, গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠিত স্রোত পরিবর্তন নেহাত শ্লোগানের ফ্রেমে বন্দি থেকে যায়। এমন দুর্বলচিত্তের কর্মীরা স্বপ্ন দেখে না, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে না, এরা মৃত্যুর পূর্বে বহুবার মরে, এরা অন্তঃসার শূন্য।
ইসলামী আদর্শের কর্মীরা সর্বকালে সকল প্রতিকূলতা মাড়িয়ে যেমন ছিল তেমনই থাকতে হবে। এটাই তাদের চির সাফল্যের পথ। এ আন্দোলনের কর্মীদের কাছে দুনিয়ার জাহেলিয়াত মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া ভিন্ন কোন বিকল্প নেই। দুনিয়াকে যারা নিজেদের মত করে গড়ে তুলতে চায় তারা যদি চলমান পৃথিবীর মানুষের চাইতে তাদের জীবন মান অনেক উন্নত করতে পারে কেবল এরাই দুনিয়ার মানুষের কাছে সম্মান, শ্রদ্ধা ও প্রিয় মানুষে রূপান্তরিত হতে পারে। এভাবেই অসৎ ও কুচরিত্রের ব্যক্তিদের রাহুর কবল থেকে মানুষ রক্ষা পেয়ে ইসলামী আদর্শকে গ্রহণ ও সমর্থন জানিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের হাতে ন্যস্ত করবে।

ইসলামী ছাত্র আন্দোলনে দেয়া সময় ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের নিজেদের সৎ, যোগ্য ও দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার সময়। এ সময় কালটি একজন তরুণ ও যুবকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিশেষ করে এ সময়টি একজন কর্মী তার জ্ঞানগত দক্ষতা, আমলিয়াতের সৌন্দর্য ও ময়দানে আন্দোলনের কাজে দক্ষতার সাথে পরিচালনার শিক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ তিনটি বিষয়ে জনশক্তির জন্য সংক্ষিপ্তাকারে উপস্থান করছি।

জ্ঞানগত দক্ষতা অর্জন :
ইসলামী আন্দোলনের ছাত্র ভাইদের ভুলে গেলে চলবে না যে, সে একজন ছাত্র। এ সময়টিতে জীবনের অন্য সময়ের তুলনায় অধিক সময় একনিষ্ঠভাবে অধ্যবসায়ের সুযোগ রয়েছে। এ সময়ে অ্যাকাডেমিক, আদর্শিক ও সমসাময়িক বিশ্ব সম্পর্কে তাকে জানতে হয়। কোন একদিকে পিছিয়ে পড়লে তাকে কখনো আদর্শিক আন্দোলনের ভাল কর্মী বলা যায় না। কুরআনে কারিমে প্রথম নাজিলকৃত আয়াতে পড়ার কথা বলা হয়েছে,
“পড় তোমরা প্রতি পালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন (সব কিছু)। ” (সূরা আলাক : প্রথম আয়াত)
কারণ মানতে হলে জানতে হবে। জানার কোন বিকল্প নেই। আল্লাহ তা’য়ালা জানা এবং না জানার মধ্যে পার্থক্যের বর্ণনা করেছেন,
“বল, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?” (সূরা জুমার-৯ নম্বর আয়াত)
আল্লাহ তা’য়ালা জ্ঞানীদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা করেছেন,
“তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং (ঈমানদারদের মধ্য থেকে) যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। ” (সূরা মোজাদিলাহ-১১ নং আয়াত)

জ্ঞান এক মহাশক্তিশালী রসদ। এ সম্পদ যদি হেদায়তের পথে ব্যবহার হয় আল্লাহ তা’য়ালা তার সেই জ্ঞানী বান্দাকে এর প্রতিদান চমৎকারভাবে। আল্লাহর রাসূল সা: বলেন,
“হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। নবী করীম সা. বলছেন, যে ব্যক্তি হিদায়েতের দিকে আহবান করে সে ব্যক্তি (তার আহবানের ফলে) যারা হিদায়েতের পথে চলে তাদের সমান প্রতিদান পায়। এ ক্ষেত্রে হিদায়েতের পথ অবলম্বনকারীদের সওয়াবের কোন কমতি করা হয় না। ”(আল-হাদিস)
অপর একটি হাদিসে রাসূল সা: জ্ঞান অন্বেষণকারীর মর্যাদা বর্ণনা এসেছে,
“হজরত আবু দারদা রা. থেকে বর্ণিত। তিন বলেন, রাসূল সা. বলেছেন- যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করার উদ্দেশ্যে পথ চলবে, আল্লাহ তা’য়ালা তার বেহেশতের পথ সহজ ও সুগম করে দেবেন। আর ফেরেশতাগণ ইলম অর্জনকারীর সন্তুষ্টির জন্য নিজের পাখা বিছিয়ে দেয়। আলিম ব্যক্তির জন্য আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু আছে সকলেই মাগফিরাতের দু’আ করে, এমনকি পানির ভেতরের মাছও। আর আবিদের ওপর আলিম ব্যক্তির মর্যাদা হচ্ছে সমগ্র তারাকাজির ওপর পূর্ণিমা রাত্রের চাঁদের যে মর্যাদা। অবশ্য আলিমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। আর নবীগণ তাঁদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে দিরহাম ও দিনার রেখে যাননি; তবে তাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে ইলম রেখে গেছেন। কাজেই যে ব্যক্তি তা আহরণ করল সে ব্যক্তি বিপুল অংশ লাভ করল। (তিরমিযি)

উপরিউক্ত কুরআনের আয়াত ও হাদিস বর্ণনার উদ্দেশ্য এই যে জ্ঞানী হতে হলে জ্ঞান অন্বেষণের তীব্র বাসনা থাকতে হয়। শুরুতেই বলেছি আন্দোলনের কর্মীরা যে যেখানে পড়াশুনা করে সেখানে সবচেয়ে ভালো কৃতিত্ব রাখবে। যেহেতু আমরা ছাত্রাঙ্গনে কাজ করি সেহেতু ক্লাসে ও রেজাল্টে কৃতিত্বপূর্ণতার কোন বিকল্প নেই। এ ছাড়াও দেশ জাতির নেতৃত্ব দেয়ার জন্য অ্যাকাডেমিক ভাল ক্যারিয়ার অর্জনের কোন বিকল্প নেই। এখানে যার যার মেধানুযায়ী অধ্যয়নে সময় দিতে হয়। অনেক ভাই এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন করেন কত ঘণ্টা পড়াশুনা করা দরকার। আমি বলি যতটুকু সময়ব্যাপী পড়াশুনা করলে শিক্ষার্থীর পড়া আয়ত্তে আসে ততটুকু পড়া দরকার। মানে শিক্ষার্থী যদি মেধাবী হয় তাহলে সময় লাগে কম। আর শিক্ষার্থী যদি কম মেধাবী হয় তাহলে সময় লাগে বেশি। তবে যারা কম মেধাবী, কম সময়ে পড়া নিজের আয়ত্তে আনতে অসুবিধা হয় তাদের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। কম মেধাবীরা বেশি সময় ধরে অধ্যয়নের ফলে পড়া জানা বুঝা ও আয়ত্তে আনার জন্য চমৎকার সুযোগ হয়। কষ্ট করে অধ্যয়নের ফলে অনেক সময় মেধাবীদের চাইতে কম মেধাবীরাও ভালো করে। মোকদ্দথা হলো কারো বেশি সময় করে অধ্যয়ন করতে হয় আর আর কারো কম। ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের ভাইদের আরো স্মরণ রাখতে হবে যে নিয়মিত স্ব স্ব ক্লাসে যোগদান করতে হবে। এতে নিজের অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ারের পাশাপাশি শিক্ষক ও ছাত্রদের সাথে ভাল সখ্য গড়ে ওঠে। যা নিজের মিশন বাস্তবায়নে ভালো কাজ দিতে পারে। যারা সংগঠনের কাজের ব্যস্ততা দেখিয়ে ক্লাস ফাঁকি দেয়া নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করে পক্ষান্তরে তারা নিজের অজান্তেই সংগঠনেরই অপূরণীয় ক্ষতি করে। এ ক্ষেত্রে শহীদ আবদুল মালেক আমাদের জন্য বড় উদাহরণ। যিনি অ্যাকাডেমিকভাবে খুব সচেতন ছিলেন আবার সংগঠনের কাজেও ছিলেন ঈর্ষণীয় অগ্রগামী।

অ্যাকাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি আদর্শের সুস্পষ্ট জ্ঞানে নিজেদের অগ্রগামী করতে হবে। কারণ আন্দোলনের একজন কর্মী যে আদর্শ প্রচার করছে তার ব্যাপারে সুস্পষ্ট জানা না থাকলে নিজের আদর্শের ছাঁচে নিজেকে ও সমাজকে আদর্শবাদীরা কিভাবে গড়ে তুলবে? এটা হবে অসম্পূর্ণ কল্পনাবিলাস! অবৈজ্ঞানিক, সর্বত্র প্রত্যাখ্যাত। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আদর্শিক জ্ঞানের উপকরণ হলো আল কুরআন ও আল হাদিস। এ ছাড়াও সাহাবায়ে আজমায়িনদের জীবন, ইসলামী সাহিত্য (যাতে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় বোঝার সহজতার লক্ষ্যে বিশদ ব্যাখ্যা সহ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, (তা ছাড়াও সংগঠন পরিচালনা, আন্দোলনের কর্মীদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি), মনীষীদের সংগ্রামী জীবন ও বিভিন্ন দেশের ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস ঐতিহ্য। কুরআন হাদিসসহ উল্লেখিত বিষয়সমূহে কেউ বিশেষজ্ঞ হতে হবে এটা কিন্তু নয়। বরং নিজেকে ইসলামী আদর্শের পায়রবি করার জন্য ও অন্যকে ইসলামী আদর্শে অনুপ্রাণিত করতে ন্যূনতম যতটুকু জানা প্রয়োজন ততটুকু অন্তত আয়ত্ব করা। নিজের মধ্যে কোন বিষয়ে জানার ঘাটতি থাকলে তা পূরণের জন্য তীব্র প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।
আদর্শবাদী দলের কর্মীদের বিশ্বব্যবস্থার জ্ঞানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলে চলবে না। অ্যাকাডেমিক ও আদর্শিক জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি চলমান বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতে হবে। ঘটনাবহুল বিশ্বের সকল খবরা-খবর, বিজ্ঞানের অতিপ্রয়োজনীয় জীবন ঘনিষ্ঠ বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণার্জন অবশ্যই জরুরি। ভাষাগত দক্ষতা ছাড়া জ্ঞানের চমৎকার বিষয়সমূহ তিমিরেই রয়ে যায়। বিশেষ করে আন্দোলনের ভাইদের মাতৃভাষার দক্ষতার পাশাপাশি আরবি ও ইংরেজি জানা অত্যাবশ্যক। তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান এ যুগে জ্ঞান অর্জন ও নিজের আদর্শ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রযুক্তির জ্ঞানার্জনের বিকল্প নেই। তাই এ বিষয়ে নিজেদের দক্ষ করে গড়ে না তোলা বড় বোকামি। এর ভালো দিকগুলো শতভাগ ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনের জন্য ভালো ফল বয়ে নিয়ে আসা সম্ভব।

জনশক্তির জ্ঞানার্জনের বিষয়ে সংগঠনের কর্মপদ্ধতিতে অত্যন্ত সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা হয়ছে : “রাজনীতি অর্থনীতি, শাসনতন্ত্র ইত্যাদি ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার পরিবর্তে এতদসংক্রান্ত জ্ঞান অর্জন করাকেই আমরা প্রাধান্য দিয়ে থাকি। নিম্নোক্ত দিকগুলোকে সামনে রেখে আমাদের জ্ঞান অর্জন করতে হবে। সর্বপ্রথম চরিত্র সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান আমাদের থাকতে হবে। জাতীয় চরিত্রের বর্তমান বিপর্যস্ত অবস্থার অন্তর্নিহিত কারণ আমাদের উদঘাটন করতে হবে এবং সমাধানের সঠিকপথ জানতে হবে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা থাকতে হবে। ইতিহাস, ঘটনাপ্রবাহ ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে বর্তমান রাজনৈতিক গতিধারার উৎস খুঁজে বের করতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে সমস্ত দল সক্রিয় আছে তাদের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য জানতে হবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় মৌলিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তাদের কোনটা কল্যাণকর আর কোনটা ক্ষতিকর তা বুঝতে হবে। রাজনৈতিক সমস্যার সঠিক সমাধান কি, এ সমাধান কোন পথে আসতে পারে তার প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে হবে। অর্থনৈতিক সমস্যার গতিধারা ও রূপরেখা জানাও আমাদের প্রয়োজন। বর্তমানে যে ধরনের অর্থনীতি চালু আছে মূলব্যবস্থাদি সংক্রান্ত জ্ঞান থাকা আবশ্যক। এ ছাড়া বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে সঠিক পথ ও পন্থা ইত্যাদি বিষয়ে স্পষ্ট জ্ঞান থাকা চাই। সাংস্কৃতিক গোলামির ভয়াবহতা সম্পর্কে আমাদের বাস্তবমুখী জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কী কী ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চালু আছে তার উৎস, রূপ ও ব্যাপকতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা আবশ্যক। কোথায় কোন পদ্ধতি কোন নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে আঘাত হানলে সাংস্কৃতিক গোলামি থেকে আমরা মুক্তি পাব তা যথার্থ জ্ঞানের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে হবে।
মোট কথা, বাতাসের ওপর ভিত্তি করে আমরা চলতে চাই না। ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ নামে মরীচিকার পেছনে ছুটতে আমরা নারাজ। আমাদের আবেদন, আমাদের যাবতীয় তৎপরতা হবে যুক্তিনির্ভর ও বুদ্ধিভিত্তিক। ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে চারিত্রিক প্রতিফলনই হবে আমাদের কাজের মূল হাতিয়ার। (কর্মপদ্ধতির ৪৩ নং পৃষ্ঠার ৫ দফার (ঘ) জ্ঞানর্জন পয়েন্ট)।

আমলের প্রতি যত্নবান ও আন্তরিক :
মুসলমানদের প্রতিটি কাজই ইবাদতের অংশ। রাসূল (সা) তাঁর জীবদ্দশায় তা হাতে কলমে সাহাবীদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। আন্দোলনের কর্মীদের বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত তাদের বাহ্যিকভাবে যাচাই বাছাই করে মানোন্নয়ন করা হয়। এক্ষেত্রে যথেষ্ট ত্রুটি থেকে যেতে পারে। কারণ অনেকের অন্তর্গত বিষয়সমূহ অজানাই থেকে যায়, এ জন্য প্রয়োজন সাহচর্য। সাহচর্যের মাধ্যমেই কেবল আসল ও নকল ব্যক্তি বাছাই করা যায়। তাই আমলে গরমিল কোন কর্মী যাতে নেতৃত্বে আসতে না পারে দায়িত্বশীল পর্যায়ে কড়া নজরদারি অত্যাবশ্যক। এমন প্রকৃতির লোকেরা নিজের অজান্তে সংগঠনের বড় ধরনের ক্ষতি করে ফেলে।

মৌলিক ইবাদত ও আল্লাহর আদেশ নিষেধ পালনের ক্ষেত্রে যত্নবান ব্যক্তিরা বাহ্যিক ও অন্তর্গতভাবে এক ও অভিন্ন থাকে। কথা ও কাজে মিল থাকে। আর যাদের গরমিল থাকে তারা সংগঠনের ব্যক্তিদের সামনে তার নামাজ, রোজা, লেনদেন, হালাল-হারাম যাচাই-বাছাই, পোশাক-আশাক পরিধান, পর্দা-পুশিদা পালন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, সংগঠনের ক্ষমতার ব্যবহার, নেতৃত্বের প্রতি লোভ না থাকা, আচার-আচরণে নিজেকে মুখলেস বান্দা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে। অথচ পক্ষান্তরে এরা ঠকবাজ। সময়ের আবর্তে অন্তঃসারশূন্যতা ও লৌকিকতা এদের ধ্বংসের দোরগোড়ায় উপনীত করে। ইসলামে কোন ঠকবাজি, শঠতা ও চটকদারিতার কোন স্থান নেই। তাই জীবনের প্রতিটি কাজে বাছাই করা ব্যক্তিরা আল্লাহর নির্দেশ পালন এবং রাসূল সা:-এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে কি না নেতৃত্বের পক্ষ থেকে তা পরখ করা জরুরী। যারা আন্দোলনের কর্মী হিসেবে বাছাই হবে তাদের ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছে-
“যারা আল্লাহর নির্দেশিত সম্পর্কসমূহ বজায় রাখে, তাদের প্রভুকে ভয় করে এবং ভীত থাকে কঠিন হিসাবের দিনের ব্যাপারে। (সূরা আর রাদ-২০)
তবে ময়দানে তৈরি হওয়া লোক পাওয়া কষ্টসাধ্য। তাই প্রয়োজন হাতে কলমে প্রশিক্ষণ। অন্তর্গত ও বাহ্যিক বিষয়ের সদৃশ কর্মীবাহিনী। এ ক্ষেত্রে কিছু লোক ফিতরাতগতভাবে ইসলামের পাবন্দি বা আল্লাহর গোলামিতে অভ্যস্ত। এ ধরনের শরীফ লোকদের নেতৃত্বের জন্য বাছাই করা। কারণ তাদের যেটুকু ঘাটতি আছে তা একটু ঘষে মেজে তৈরি করা সম্ভব। তার মানে এটা নয় যে অন্যরা ইসলামী আন্দোলনে শামিল হবে না, নেতৃত্বে আসবে না। তাদেরকেও প্রশিক্ষণ ও উত্তম সাহচর্যের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনে অগ্রসর করা সম্ভব। ইসলামী আন্দোলনের কাঙ্খিত মানের আমলের অভাবে অনেক ইসলাম পিপাসু ছাত্র-যুবক ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা পায় না অথবা তাদের কাছে যখন মনে হয় যে সত্যিকারার্থে এটি ইসলামী আন্দোলন হতে পারে না, তখন তারা আন্দোলনে শামিল না হয়ে দুরে সরে পড়ে। তাই ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আমল সর্বতোভাবে হবে অনেক উন্নত, যা দেখে অন্যরা হবে অনুপ্রাণিত। যাদের দেখে মানুষের মাঝে ইসলামের প্রতিচ্ছবির কথা মনে পড়বে, অন্যের জন্য চক্ষু শীতলকারী হবে। তারা আলোতে যেমন অন্ধকারেও তেমন। তাদের প্রতিটি আমল হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে।

ময়দান পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন:
ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের ভাইদের মৌলিকভাবে দু’টি কাজ-
(১) নিজেকে সৎ, যোগ্য ও দক্ষ ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তোলা
(২) ছাত্রদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেয়া।
এ দু’টি কাজই সমাজ পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠন হলো এর চালিকাশক্তি। এর ব্যাপ্তি বাড়াতে হলে মজবুত সংগঠন ও দক্ষ সংগঠকের কোন বিকল্প নেই। যারা সংগঠক হিসেবে ছাত্রজীবনে দক্ষতা অর্জন করবে তারা বাস্তব জীবনেও এর সুফল পাবে। বিশেষ করে সংগঠনের মিশন ও ভিশন বাস্তবায়ন করাই সংগঠকদের মূল কাজ। এ জন্য সংগঠকদেরকে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়। পরিকল্পনা গ্রহণের সময় সংগঠনের শক্তি সামর্থ্যের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হয়। আবার প্রতিকূল পরিবেশ ও অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে সংগঠনের মূল কাজ বন্ধ রাখাও সমীচীন নয়। পরিকল্পনা গ্রহণ ও এর তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধুমাত্র সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় অনেক কিছুই করা সম্ভব। আবার অপরিপক্ব পরিকল্পনা বা পরিকল্পনাহীনতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক সম্ভাবনা অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে যায়। এসব কিছু ময়দানে হাতে কলমে শিক্ষা প্রদান ও যোগ্য সংগঠকদের অনুসরণের মাধ্যমে কর্মীবাহিনীকে সংগঠন পরিচালনায় প্রশিক্ষিত করে তোলে। একজন সংগঠক নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদেরকে সহজেই সংগঠিত করতে পারে।

সংগঠকরা সংগঠনের ভেতরে বাইরের কোন দুর্যোগে টলে না। শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও দক্ষ নাবিকের মতো লক্ষ্যপানে চলতে থাকে। সংগঠন সম্প্রসারণ, কর্মীবাহিনীর সুষ্ঠু তদারকি, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট তথ্য সংরক্ষণ ও সংগঠন মজবুতীকরণ সংগঠনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ কাজ করতে গিয়ে নেতৃত্ব শত প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। এর মাধ্যমেই সঠিক নেতৃত্ব বাছাই ও নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। ইসলামী আন্দোলনের আর একটি অংশ হলো রাজনীতি। শুধু রাজনীতি করলেই ইসলামী আন্দোলন হয় না। সমাজ থেকে অসৎ নেতৃত্ব পরিবর্তন করে আল্লাহর প্রতিনিধির নেতৃত্বে ইসলামী কল্যাণমূলক রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা লাভ করাই হবে এ রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য। কোন প্রস্তুতি ছাড়া প্রত্যাশিত ইসলামী নেতৃত্ব তৈরি হয় না, এতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এখানে ব্যক্তি নিজে নেতৃত্ব চেয়ে নিতে পারে না। এখানে নেতৃত্ব প্রত্যাশা করাও গুনাহের কাজ। ইসলামী সংগঠনে মূল নেতৃত্বকেই নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পন্ন জনশক্তিদেরকে নেতৃত্বের জন্য বাছাই করে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করবে। কর্মীদের মধ্যে নানা গুণাবলিসম্পন্ন ব্যক্তিদের সম্মিলন ঘটে। যে ব্যক্তি যে কাজের জন্য উপযুক্ত তাকে সে কাজে লাগানো বা সে কাজে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা। দক্ষ ম্যানপাওয়ার বাছাইয়ের জন্য ‘ম্যানপাওয়ার প্ল্যানিং’ অত্যন্ত জরুরি বিষয়। মোদ্দাকথা হলো সংগঠন দক্ষতার্জনকারীরা সঠিকভাবে তাদের ওপর প্রদত্ত দায়িত্ব পালন করতে পারে। তাই ছাত্র-ইসলামী আন্দোলনে যাদের ওপর সংগঠনের যে দায়িত্ব থাকবে তা সুষ্ঠুভাবে পালনের জন্য শতভাগ চেষ্টা করবে।

একাধারে জ্ঞানগত যোগ্যতা অর্জন, আমলিয়াতে সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও সংগঠন পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন চাট্টিখানি কথা নয়। সবাইকে সব বিষয়ে এক্সপার্ট হতে হবে এটাও জরুরি নয়। সংগঠনের কিছু ব্যক্তিকে বিভিন্ন বিষয়ে এক্সপার্ট হতে হবে, যাতে ইসলামী কল্যাণমূলক রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে এবং এর সঠিক ধারণা মানুষের সামনে তুলে ধরে এর সুফল লাভের বিষয়ে ধারণা দিতে পারে। নেতৃত্বের জ্ঞানপিপাষু মনোবৃত্তি ও সুন্দর আমল নেতৃত্বকে আরো বেশি বিকশিত করে।


Leave a Reply