২৮শে অক্টোবর- যে ইতিহাস কালেমার পতাকা নিয়ে উন্নত মম শিরে সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার

২৮শে অক্টোবর- যে ইতিহাস কালেমার পতাকা নিয়ে উন্নত মম শিরে সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার

পৃথিবীর আদি থেকে অন্ত সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব অনিবার্য। সত্যের আগমনে মিথ্যার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। হককে চিরতরে মিসমার করার প্রয়াস সেই হাবিলের বিরুদ্ধে কাবিলের দ্বন্দ্ব থেকে, যা চলছে, চলবে অনাদিকাল, কিয়ামত অবধি। সত্যযে কত দামি! তার নিজের তুলনা কেবল নিজেই। মিথ্যা কতটা কপট সত্যই কেবল তার মুখোশ উন্মোচন করে। পৃথিবীর শুরু থেকে কারবালার বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এক একটি কারবালা মিল্লাতে মুসলিমাহকে পুনরায় উজ্জীবিত করে সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার তরে, শিক্ষা দেয় বাতিলের কাছে মাথা না নোয়াবার। প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও বাতিলের নখর থেকে রেহাই পায়নি। হিংস্র আঁচড়ে বিক্ষত করেছে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অবয়বে।

 

বাতিলের সাথে এখানে দ্বন্দ্ব সংঘটিত হয়েছে ২৮ অক্টোবর, ৫ মে। হয়তো অপেক্ষা করছে, আরো কোন ২৮ অক্টোবর, ৫ মে অথবা ভিন্ন কোনো ঘটনা। আজরক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর ২০০৬ এর নবম বার্ষিকি। যে ২৮ অক্টোবর রক্ত মোড়ানো একটি নাম। আটাশে অক্টোবর আল্লাহর রাহে নিজেদের দ্বিধাহীন চিত্তে বিলিয়ে দেওয়ার ঘটনার নাম।যে দিনটি আমাদের প্রেরণা জোগায়, আটাশ শেখায় উন্নত মম শির, যে শির নয় নত করার,সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার।

 

এদেশে প্রতিটি ঘটনার মূলেই ইসলামবিদ্বেষনীতি। ইসলামী অগ্রযাত্রাকে এ দেশে দমিয়ে দেয়া। ইসলামী নেতৃবৃন্দের চরিত্রে কালিমা লেপন। কিন্তু ইসলামী আদর্শবাহীরা তাদের মিশনের ওপর কায়েম থাকতে পারে দৃড়তার মিনারের মত করে, তাদের রুখতে পারে সাধ্য কার?সকল প্রতিকূলতা মাড়িয়েই দ্বীনের মুজাহিদরা আল্লাহর জমিনে তার দ্বীন কায়েমে বদ্ধপরিকর থাকবে এটাই চিরন্তন সত্য। যারা দুনিয়ার সকল ভয় লোভ লালসা কপটতাকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে আল্লাহর গোলামিকেই জীবনের অমূল্য চাওয়া পাওয়া হিসেবে চূড়ান্ত করে নিয়েছে তাদের কিসের শঙ্কা! আল্লাহই তাদের জন্য যথেষ্ট।আদর্শবাদীদের হত্যা করে আদর্শের প্রচার প্রসার নিঃশেষ করা যায় না, যেমন অতীতে যায়নি। অচিরেই অমানিশার সকল কালো অধ্যায় মাড়িয়ে কালিমার পতাকা পত পত করে উড়বে এ দেশের আকাশে। নারায়ে তাকবিরের শ্লোগানে মুখরিত হবে তরুণ জিন্দাদিল মোজাহিদান। যাদের কাছে জীবনের চেয়ে ঈমান অনেক দামি। আটাশে অক্টোবর বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই এক কালো অধ্যায়। যা বাংলার ইসলামপন্থীদের প্রেরণার পিরামিড, যা অনাদিকাল নতুনদের প্রেরণার খোরাক জোগাবে।

 

২৮ অক্টোবর চারদলীয় ঐক্যজোটের সরকারের মেয়াদকালের পরদিন নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ছিল প্রথম দিন। পল্টনে বিএনপি ও বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট ছিল জামায়াতের পূর্বনির্ধারিত এবং অনুমোদিত সভাস্থল। পাল্টা আওয়ামী লীগও পল্টন ময়দানে সভা করার ঘোষণা দেয়। এ যেন রাজনীতির চরম শিষ্টাচারিতার লঙ্ঘন। যার কারণে বিএনপি সংঘাত এড়িয়ে নির্ধারিত স্থানে তাদের সমাবেশ না করে নয়া পল্টন দলীয় কার্যালয়ের সামনে তাদের কর্মসূচি পালন করছিল। বাকশালী আওয়ামী লীগ তাদের নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে ভয়াল নগ্ন চেহারা সেদিন প্রদর্শন করে। তাদের কার্যালয় বাদ দিয়ে জামায়াতের নির্ধারিত সভাস্থল বিনা উসকানিতে দখলের চেষ্টা করে সাহারা, তোফায়েল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মায়া, ডাক্তার ইকবাল ও হাজী সেলিমের লগি-বৈঠা বাহিনীর নেতৃত্বে। ক্যামেরার উপস্থিতিতেই ক্ষমতা দখলের নেশায় মত্ত কথিত স্বাধীনতার চেতনার একক দাবিদার আওয়ামী হায়েনাদের তাণ্ডবে সেদিন জান্নাতের পাখি হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন টগবগে অকুতোভয় তরুণ শহীদ মুজাহিদ, শিপন, রফিক, ফয়সাল, মাসুম ও শাহাজাহান আলী। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদদের কাতারে নাম লিখালেন শহীদ জসিম-১, সাবের, শহীদ জসিম-২, আরাফাত, আব্বাস, রুহুল আমিন, হাবিব ও বয়োবৃদ্ধ জাবেদ আলী। জীবনের স্বপ্নসাধ তাদেরকে মুহূর্তের জন্যও স্থির লক্ষ্য হতে বিচ্চ্যুত করতে পারেনি। এ যেন শাহাদাতের পেয়ালা পানের এক অপ্রতিরোধ্য প্রতিযোগিতা। আন্দোলনের সাথীরা ইয়ারমুকের যুদ্ধের মতো পানি পান না করে পাশের ভাইকে পানি পান করানো, নিজের সুরক্ষা নয়, আন্দোলনের ভাইয়ের সুরক্ষার জন্য ইস্পাতদেয়াল হয়ে যায়। দুনিয়ার মায়ামমতা যেন তাদের কাছে তুচ্ছ। নিজেরা মজলুম হয়েছিল সেদিন, জালিমের কাতারে শামিল না হয়ে শহীদের কাতারে রিক্তহস্তে নিজেদের শামিল করে কালের অনাগত বিপ্লবীদের প্রেরণার উৎস মিনারস্বরূপ। সেদিন সাম্রাজ্যবাদীদের নখরে ফ্যাসিবাদীদের জয়ধ্বনিতে বাংলাদেশের রাজধানী থেকে শুরু করে অজপাড়াগাঁয়েও এর আঁচড় লেগেছিল। যে কারণে একটি অনাকাঙ্খিত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। যার মাধ্যমে পরবর্তীতে সাজানো নির্বাচন প্রত্যক্ষ করল সমগ্র জাতি।ক্ষমতায় এলো বাকশাল-স্বৈরাচারের ঐতিহ্য। সেই ধারাবাহিকতা চলছে এখনও। আটাশে অক্টোবরের বিচার হয়নি আজও, খুনিদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার হয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে, খুনিরা পেয়েছে রাষ্ট্রীয় পদ ও পৃষ্ঠপোষকতা, বিচারের কথা ওঠানোও এখন যেন পাপ!

 

আটাশে অক্টোবর আমাদের ধমনিতে, রক্তে, শিরায়-উপশিরায় ইসলামবিদ্বেষী ক্ষমতান্ধদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড এক দ্রোহের নাম। যে ইতিহাস খুনিদের বিরুদ্ধে কাল থেকে কালান্তরে ঘৃণা ছড়াবে, যে ইতিহাস বাতিলের কাছে শির নত না করে জীবন বিলিয়ে দিয়ে দ্বীনের মর্যাদা রক্ষায় অনুপ্রেরণা জোগাবে। আজ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে কারবালার মতো নিষ্ঠুরতা চলছে। শুধু আমাদের দেশে ঘটে চলছে তা-ই নয়; বরং আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, ইরাক, সিরিয়া, লেবাননসহ বিভিন্ন স্থানে মুসলমানরা একদিকে মুনাফিক সরকারপ্রধান এবং অন্য দিকে কোথাও কোথাও কাফির, মুশরিক ও ইহুদিদের হাতে চরমভাবে নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত হচ্ছে। এদের বিচার একদিন হবে ইনশাআল্লাহ। সেদিন পার হবার বা পালিয়ে যাওয়ার কোন উপায় থাকবেনা।

 

ইসলামবিদ্বেষীদের এক একটি ছোবল যেন এক একটি কারবালা! এ অবস্থায় কারবালার শিক্ষা বুকে ধারণ করে বিশ্বমুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার ও মোকাবেলাই একমাত্র মুক্তির পথ। মুসলমানদের সর্বোচ্চ ঈমানী বল ও সর্বশক্তি নিয়োগ করলে ইসলাম জিন্দা হবে এবং সারা বিশ্বে আবার মুসলমানরাই বিজয়ী হবে, ইনশাআল্লাহ!

 

কবি আল্লামা ইকবালের ভাষায়-

“কা্ৎলে হোসাইন আসল মে মারগে ইয়াজিদ হ্যায়

ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কি বাদ”।

 

লেখক : কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

 


Leave a Reply